Bangladeshi Broadsheet

One stop web portal for Bangladeshies in Australia

Next Text Post New Entry

In search of a vater hotel in Melbourne.

Posted by Ashraful Alam on January 24, 2013 at 9:10 AM

মেলবোর্ণে ভাতের হোটেলের সন্ধানে


ঢাকা শহরে দেড় দশক অবস্থানের সুবাদে নানান কিসিমের হোটেলে ভক্ষণ করবার সুযোগ আমার হয়েছে, তবে এর মধ্যে আমার সবচেয়ে প্রিয় হল সেই হোটেলগুলো, যেগুলোকে সাধারনত 'ভাতের হোটেল' নামক এক অলিখিত ক্যাটাগরিতে ফেলা হয়। বাংলাদেশে যেমন বই বিক্রীর দোকানকে লাইব্রেরী বলে, অনেকটা সেইরকম নিপাতনে সিদ্ধ ভাবেই খাবারের দোকানকে বা ভোজনালয়কে হোটেল বলে। রেস্টুরেন্ট কথাটাও অবশ্য চালু আছে। নীলক্ষেতের 'সংগ্রাম' হোটেলের নাম অনেকেই শুনে থাকবেন, কিম্বা মহাখালীর 'জলখাবার' অথবা মগবাজার মোড়ের 'থ্রি-স্টার' হোটেলের নাম। ফার্মগেটের আশেপাশে এরকম বেশ কয়েকটি ভাতের হোটেলে আমার প্রচুর যাতায়াত ছিল দীর্ঘদিন গ্রীনরোড এলাকায় থাকার কারনে। কলেজ/বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাসের খাবারে অরুচি এলেই ঢুঁ মারা হত কোন সস্তা ভোজনালয়ে, আর ভেতো বাঙ্গালী হিশেবে মাত্র ২০/৩০ টাকায় পেটপুরে ভাত খাওয়ার লোভ সামলাতে না পেরে ভাতের হোটেলই হত আমার গন্তব্য। অনেকে অবশ্য নোংরা বা অস্বাস্থ্যকর এইসব অজুহাতে খেতে চাইত না এসব খাবার-বিপণীতে, তবে আমার পৈতৃকসুত্রে প্রাপ্ত পাকযন্ত্রটির ঈর্ষানীয় দক্ষতা ও সবলতার গুণে আমি এসব ভাতের হোটেলের নিয়মিত কাস্টমার ছিলাম বরাবরই।

 

ভাতের হোটেলের সঙ্গে মানে/দামে/মর্যাদায় এর উপরের শ্রেনীর হোটেলগুলোর একটা বড় পার্থক্য হলঃ এইসব ভাতের হোটেলে কোন মেনু কার্ডের বালাই নেই। বেসিনে হাত-মুখ ধুয়ে নিয়ে টেবিল দখল করে সরাসরি আওয়াজ দিন, "মামা, ভাত লাগান" - সঙ্গে সঙ্গে ভাত হাজির। কি দিয়ে খাবেন? চিন্তার কিছু নাই, ভাতের সঙ্গে সঙ্গে ওয়েটাররুপী জীবন্ত মেনুকার্ড ও মুল্যতালিকা হাজির। আপনি একা হলে অন্য এক বা একাধিক ভোজনার্থীর সঙ্গে একই টেবিলে খেতে হবে। সবার সেটা ভাল না লাগলেও আমার কিন্তু বেশ লাগে। তরকারীর ঝোল শেষ হয়ে গেলে মামার কাছে এক বা একাধিকবার মামার বাড়ির আবদার করতে পারবেন, যেটা একটু ভদ্রগোছের হোটেলে চলে না। এতসব কারনে আমার গৃহ-বহির্ভুত ক্ষুন্নিবৃত্তির প্রধান আস্তানা ছিল ঢাকার বিভিন্ন ভাতের হোটেল। নীলক্ষেতের তেহারির দোকানগুলোও আমার পছন্দের তালিকায় ছিল, যেমন ছিল সায়েন্স ল্যাবোরেটরীর মোড়ের মালঞ্চ নামক গ্রীল চিকেনের দোকান। ওপথে যাওয়া পড়লে কাঁচা মরিচ আর পেঁয়াজ সহযোগে দু'প্লেট তেহারী কিম্বা নান রুটির সঙ্গে দু'পিস গ্রীলড চিকেন মেরে না দিয়ে কখনোই ফেরা হত না। এসব হোটেলে মেনু পছন্দ করবার বালাই নেই - তেহারীখানায় শুধুই তেহারী পাবেন, আর গ্রীল চিকেনের দোকানে শুধুই চিকেন সহযোগে নান রুটি।

 

তিনবছর আগে যখন দেশ ছাড়ি অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নের উদ্দেশ্যে, তখন দেশের অনেক কিছুই হারিয়েছি, যার মধ্যে অন্যতম হল যখন তখন রাস্তার পাশের ভাতের হোটেলে বা তেহারীখানায় ঢুকে 'মামা, খানা লাগাও' বলার স্বাধীনতা। শুনেছি সিডনীতে নাকি আজকাল বাংলাদেশী স্টাইলে তেহারীর দোকান হয়েছে; আমরা মেলবোর্নবাসীরা এখনো অতটা ভাগ্যবান নই। মেলবোর্নে বাংলাদেশী খাবারের রেস্টুরেন্ট হাতে গোনা মাত্র হালি দেড়েক, আয়তনে বিশাল এই নগরীর নানান এলাকায় ছড়িয়ে ছিঁটিয়ে। আর সে সব হোটেলও ঠিক ঢাকার ভাতের হোটেলের মত নয়, সাহেবী স্টাইলে মেনু কার্ড দেখে অর্ডার দিয়ে ১৫/২০ মিনিট পরে খাবার আসে। তাতে অভিজাত হোটেলে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে বাসমতি চালের স্টীমড রাইস উইথ স্লো কুকড গোট কারী খাওয়ার স্বাদ মেলে, ডিমের তরকারী বা খাসির মাংস (গোট আবার কি বস্তু? বাংলাদেশে সব খাসি!) দিয়ে নাজিরশাইল চাউলের ভাত অপরিচিত কারো সঙ্গে একই টেবিলে বসে খাওয়ার আমেজ পাওয়া যায় না। কিছু ভারতীয় রেস্টুরেন্টে বিরানী পাওয়া যায়, তবে সার্ভিস/দাম/মানের দিক থেকে এরাও অভিজাত হোটেলের পর্যায়ে পড়ে, ভাতের হোটেলের ক্লাসে নয়। এদেশে পথচলতি খাবার হল সাবওয়ে, ম্যাকডোনাল্ডস আর কেএফসির মত ফাস্ট ফুড অথবা চাইনীজ/ভিয়েতনামীজদের ফ্রাইড রাইস উইথ ভেজিটেবল কিম্বা নানান পদের মাংস, অথবা আফগান/লেবানীজ/তার্কিশ দোকানে কাবাব ও রুটি। এগুলোর কোনটাই খেতে খারাপ না, তবে ভাতের স্বাদ কি আর ফ্রাইড রাইস বা রুটি-কাবাবে মেলে? তারপরে আছে হারাম-হালালের ঘাপলা - ফলে সিংহভাগ প্রবাসী বাঙ্গালীরা বাসার বাইরের খাবার তেমন খান না বললেই চলে। এখানে এসে ধর্মপ্রাণ বাঙ্গালী মুসলিমেরা আবার মাংস ছাড়াও আইসক্রীম বা কেকের মধ্যেও হালাল-হারাম খোঁজেন, তবে সেটা ভিন্ন প্রসংগ। ম্যাকডোনাল্ডসের আলুর চিপসও নাকি হারাম, লোকমুখে শুনতে পাই। আমি অবশ্য স্বল্পাহারী এবং সর্বভূক - শুকরমাংস এবং কিছু নাম না জানা সামুদ্রিক মাছ ছাড়া মোটামুটি সবই খাই, খেতে খারাপ না লাগলে।

যাই হোক, নতুন দেশে এসে অনেক নতুনের ভিড়ে পুরাতন সেই অভ্যাস আর ছাড়তে পারি না, তাই ভাতের হোটেলের সন্ধানে শহরের ও শহরতলির অলিগলিতে উঁকিঝুঁকি মারতে থাকি। এরই মাঝে একদিন ভাগ্যদেবী সহায় হোন, আর আমি পেয়ে যাই এমন এক খাবারের হোটেল, যেখানে মেনু কার্ডের বালাই নেই (কারন, মেনু একটাই, বসে বসে আরাম করে খাবার খেয়ে একই টেবিলে অন্যদের সঙ্গে পানির জাগ ও গ্লাস শেয়ার করতে হয় (মেলবোর্নে এটা বিরল ঘটনা। ঢাকাইয়া স্টাইলে বারবার ঝোল চাওয়ার মত দ্বিতীয়বার কিম্বা প্রয়োজনবোধে তৃতীয়বার খাবার চেয়ে নেওয়া যায়। কোন কার্ড-ফার্ডের জায়গা নেই - নগদের কারবার, ইন ক্যাশ দে ট্রাস্ট! খেতে বসলে আশে পাশের টেবিলে (অথবা ভীড়ের সময়ে আপনার নিজের টেবিলেই অনেক ভারতীয়-অভারতীয়-সাদা-কালো-বাদামী ভোজনরসিককে পাবেন, যারা খাবারের আদবকায়দার তথা টেবিল ম্যানার্সের গুষ্টি কিলিয়ে শুধুমাত্র উদরপুর্তিতেই ব্যস্ত। খাবারের উদ্দেশ্য তো সেটাই, নাকি? অবস্থান মেলবোর্নের শহরকেন্দ্রে, যাকে বলে কিনা, একেবারে সোনায় সোহাগা। এই হোটেলের সামনের রাস্তায় আবার একজন স্টাফ দাঁড়িয়ে থেকে পথের সব পথিককে একটা করে কাগজ ধরিয়ে দেয়, যাতে এই ব্যতিক্রমী ভোজনালয়ের 'পেটচুক্তি' খাবারের অফারের বর্নণা থাকে। অনেকটা যেন নীলক্ষেতের ফুতপাতে তেহারীখানার শেফদের চীতকার - মামা, আসেন, গরম গরম তেহারী আছে। যারা অল্প ডলার পকেটে নিয়ে ঘোরেন, এবং ক্ষুন্নিবৃত্তিই যাদের কাছে খাবারের একমাত্র কাজ, তারা এই অফার ফেলতে পারেন না। যেমন আমি। একটা গোলাকার বড় থালার আলাদা আলাদা চেম্বারে রঙ্গীন ভাত, বাটার নান, আলু-বেগুনের ঝোলের তরকারী, মটরশুঁটি/ছোলা/নানা রকম বীনের তরকারী, একটু আচার। একসময় আমি কাজ করতাম এই হোটেলের থেকে হাঁটার দুরত্বে, কাজেই দুপুরে বাসা থেকে লাঞ্চ না এনে এখানেই আমার খাওয়া-দাওয়া সারতাম, আর বাংলাদেশে আমার সর্বশেষ কর্মস্থলের নিকটস্থ বনানী বাজারের দোতালার 'তেহারী নাম্বার ওয়ান'-এ কাটানো লাঞ্চ আওয়ারগুলির স্মৃতি নিয়ে জাবড় কাটতাম।

আগ্রহীদের জন্য এই হোটেলটির নাম আমি বলব, তবে সবাই সেখানে খেয়ে সেই মজা নাও পেতে পারেন, যা আমি পেয়েছি। বাংলাদেশে ভাতের হোটেলে যাওয়ার অভ্যেস না থাকলে এই বিদেশে এসে খাবার দাবার নিয়ে ঝুঁকিপুর্ণ এডভেঞ্চারে না নামাই ভাল। তবে হ্যাঁ, নতুন করে অভ্যাস করে দেখতে ক্ষতি কি? নাইবা হল সাহেবী স্টাইলে খাওয়া - পেটপুরে খাওয়া তো হবেই, যাকে বলে একেবারে পয়সা উসুল করে তৃপ্তিও পাবেন। ওম ভেজিটেরিয়ান, ২৮ এলিজাবেথ স্ট্রীট (ফ্লিন্ডার্স স্ট্রীট স্টেশান থেকে খুবই কাছে এবং ২২৭ কলিন্স স্ট্রীট (কর্নার অফ কলিন্স এন্ড সোয়ানস্টন স্ট্রীট, এই দুই স্ট্রীট থেকেই ঢোকা যায়। ঠিক ভাতের হোটেল নয়, আবার দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানোও নয়। মেলবোর্নে তিন বছরে খুঁজে ভাতের হোটেলের চরিত্রের এর চেয়ে নিকটতম আর কিছু পাই নি। ভাতের হোটেল জিন্দাবাদ (স্যরি, জয় ভাতের হোটেল।

Categories: Chirkut, Japito Jibon

Post a Comment

Oops!

Oops, you forgot something.

Oops!

The words you entered did not match the given text. Please try again.

Already a member? Sign In

0 Comments